Thursday , September 16 2021
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
Home / মতামত / মোকাররম জামিলের ছোটগল্প ‘আত্মহত্যা’

মোকাররম জামিলের ছোটগল্প ‘আত্মহত্যা’

আত্মহত্যা
মোকাররম জামিল

প্রতিটি মৃত্যুই যন্ত্রণার, কষ্টের। আর তা যদি হয় আত্মহত্যা তবে যেন তা মেনে নেয়া সবচেয়ে কষ্টকর। কিন্তু বিশ্ব জুড়ে আত্মহত্যার ঘটনা বেড়েই চলছে। সমান তালে বাংলাদেশেও পাল্লা দিয়ে বাড়ছে আত্মহত্যার ঘটনা।
প্রযুক্তির প্রসার, সামাজিকতার পরিবর্তে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে নির্ভরশীলতা, সহনশীলতা ও ধৈর্যের চর্চা কমে যাওয়া, পারিবারিক কলহ, বিবাহ বিচ্ছেদ, প্রেমে বর্থ্যতা, মানসিক বিষণ্নতার কোন চিকিৎসা না পাওয়া, আর্থিক অনটনসহ নানা কারণে বিশ্বব্যাপী আত্মহত্যার ঘটনা যেন বেড়েই চলছে।
প্রেমে ব্যর্থতার জন্য এরকমই একটি ঘটনা ঘটে গেছে আবিরের সাথে। আবির তখন ক্লাস টেনের ছাত্র। হাসিখুশি, আড্ডা, খেলাধুলা আর ঘোরাফেরার সাথে সমানতালে যেন তার পড়াশোনা ও চলতেছিল। নিয়মিত প্রাইভেট রেগুলার পড়াশোনা,সবার কাছে যেন আবির পরিচিত মুখ।সেদিন প্রাইভেটে ঢুকতেই হঠাৎ চোখ গেলো এক মিষ্টি রমণীর দিকে।নতুন এসেছে।এতো সুন্দর মেয়ে যেনো সে আগে কোথায় দেখেনি।এভাবে ২,৩দিন দেখদেখির মধ্যেই চলতে থাকলো।প্রতিদিন রাত এ আবির মেয়েটাকে কল্পনায় আনে।প্রেমে পড়ে গেলো না ত আবির।ভাবতে থাকে।এতো সুন্দর মেয়ে।খোঁজ খবর নিয়ে দেখেছে ভালো স্টুডেন্ট ও।সে আর মেয়েটাকে হাত ছাড়া করতে চায় না।আজকে সে মেয়েটাকে তার ভালোবাসার কথা বলবেই।তা না হলে যদি তার প্রথম ভালোবাসা হারিয়ে যায়।প্রাইভেট শেষে হঠাৎ পিছন থেকে বলে উঠলো নিলা শোনো,
নিলা:হ্যা বলো।
আবির:কিছু কথা ছিলো।
নিলা:হ্যাঁ বলো সমস্যা নেই।
আবির:নিলা,তোমাকে আমার খুব ভালো লাগে।প্রথম দেখায় তোমার প্রতি খুব উইক হয়ে গেছি আমি।তোমাকে আমি আমার করে নিতে চাই।
নিলা কিছু না বলে চলে গেলো।যদিও নিলা বার বার খেয়াল করেছে আবির তার দিকে সবসময় তাকিয়ে থাকে। প্রাইভেট শেষে পিছে পিছে আসে।কিন্তু এদিকে নিলা ও তাকে মনের মধ্যে কল্পনায় আনত।রাত এ ঘুমানোর আগে আবির কে নিয়ে না ভাবলে যেন তার ঘুম ই আসে না।কিন্তু এটি ছিলো তার কল্পনার মধ্যেই সীমাবদ্ধ। কারন তার পরিবার এগুলা পছন্দ করত না।প্রেম ভালোবাসা এগুলাকে এই বয়সে তার পরিবার প্রশ্রয় দিতো না।এই সীমাবদ্ধতার জন্য এইগুলা প্রেম ভালোবাসা নিয়ে নিলা ভাবার সাহসই পেতো না।তার পরেও যেনো আবিরকে তার ভালোলেগে গিয়েছিলো।কিন্তু সে ত চাইলেই ভালোবাসার মিলনে জরিয়ে যেতে পারবে না।
সে জন্য এইগুলো তার কল্পনায়ই রেখে দিতো।কিন্তু আবিরের জন্য তার কষ্ট হতো।এতো ভালোবাসে তাকে।
নিলে সেদিন রাতেই তার বান্ধবী লাবিবার থেকে আবির এর নাম্বার ম্যানেজ করে আবির কে কল করে।
নিলা:হ্যালো আবির।
আবির:জ্বি,কে??
নিলা:আমি নিলা।
আবির:কি সত্যি,নিলা তুমি আজকে হঠাৎ চলে গেলে কিছু না বলে আমার জান যেনো বের হয়ে যাচ্ছিলো।প্লিজ তুমি কিছু বলো।নিলা আমি তোমাকে খুব খুব ভালোবাসি,প্লিজ তোমাকে আরো ভালোবাসার সুযোগ দাও আমাকে প্লিজ নিলা।তুমি কিছু বলো।

নিলা:দেখো আবির,আমার পরিবার এগুলা পছন্দ করে না।এইগুলা থেকে আমকে একদম দূরে থাকতে বলছে।প্লিজ আবির আমাকে তুমি ক্ষমা করে দাও।
আবির:নিলা আমি তোমাকে কিভাবে বুঝাবো আমি নিজেও জানিনা।হঠাৎ অজান্তেই আমি তোমার প্রেমে পরে গেছি।এখন চাইলেও তোমাকে ভুলতে পারবো।নিলা প্লিজ আমাকে বোঝার ট্রাই করো।

নিলা:আমি বুঝতে পেরেছি।কিন্তু আমার ত্ব কিছু করার নাই আবির।ক্ষমা করে দাও আমাকে প্লিজ।

এদিকে নিলাও অনেক কষ্ট পায় সে ও আবিরকে খুব ভালোবাসে।তার কল্পনায় সবসময় আবির থাকে কিন্তু মুখফুটে বলতে পারে না আবিরকে।কি করেই বা বলবে,তার পরিবার যদি একবার জানতে পারে,তাহলে ব্যাপারটা আবিরের ফ্যামিলি পর্যন্ত যাবে।এটি নিলা কখনোই চায় না। চায় না আবিরের কিছু হোক।করন সে যে তাকে অনেক ভালোভাসে।আবির কল করতে থাকে। নিলা আর কল ধরে না।নিলা কয়েকদিন প্রাইভেটে আসে না।আবির অনেক খোঁজ করে।তার নাম্বারও ব্লাককিস্ট করে রাখছে।আবিরের এর মধ্যে পড়াশোনার সব গেছে।শুধু নিলার কথা ভাবে সারাক্ষণ। তার কি কিছু হলো নাকি। নিলা প্রাইভেট ছেড়ে দেওয়ায় আবির ও প্রাইভেটে যায় না।এভাবে কয়েকমাস চলতে থাকে।হঠাৎ আবির তার বন্ধুর দ্বারা জানতে পারে যে নিলা প্রাইভেট শুরু করেছে।পরের দিনই আবির প্রাইভেটে যায়। প্রাইভেট শেষে নিলাকে ডাকে।নিলা কথা বলতে না বলতেই নিলার বাবা সামনে হাজির।নিলা গাড়িতে উঠো।নিলার বাবা বিষয়টি লক্ষ্য করলেও কিছু বললো না।পরের দিনও একই ঘটনা ঘটেছে।নিলার সাথে কথা বলতে গিয়ে নিলার বাবা তাকে দেখে ফেলেছে।এরপরেও আবির কিছু করতে পারলো না।এতোদিনের অব্যক্ত উক্তি গুলো কবে বলবে যে নিলা কে।আবির রীতিমতো খাপছাড়া হয়ে যাচ্ছিলো।পড়াশোনা, খাওয়াদাওয়া প্রায় ছেড়েই দিয়েছিলো নিলার চিন্তায়।

নিলাকে তার বাবা বাসায় নিয়ে যাওয়ার পর নিলাকে বলে ছেলেটা কে।নিলা বলে একি সাথে প্রাইভেট পড়ি বাবা।
তার বাবা বলে বুঝিনা কিছু।আমি তোর বয়স পার করে এসেছি।এইসব ধান্দাই পড়েছিস তুই।পড়াশোনা বাদ দিয়ে এই করতে আমি তোকে পাঠাইছি।আজ থেকে তোর বাইরে যাওয়া বন্ধ।বাসার বাইরে পা দিতে পারবি না তুই।

নিলাকে তার বাবা বাসা থেকে বের হওয়া বন্ধ করে দিয়েছে।আবির প্রাইভেটে নিলার অপেক্ষায় থাকে।নিলা আসে না।এভাবে একের পর এক অপেক্ষা করার পরও নিলা আসে না।অনেক যোগাযোগ করার চেষ্টা করেছে আবির।কিন্তু কোনো লাভ হয়নি।নিলার থেকে তার বাবা ফোন নিয়ে নিয়েছে।বাসা থেকে বের হতে দেয়নি।এভাবে আর কিভাবে চলবে আবিরের দিন।দিনের পর দিন না খেয়ে থেকে আবির প্রায় সুখে গেছে।পড়াশোনা না করার জন্য আবিরের বাসা থেকেও অনেক চাপ।সারারাত যেনো জেগে জেগেই পার হয় আবিরের।

এদিকে নিলাও আবিরের কথা ভাবে।সারাক্ষণ কাঁদে।তার বাসায় বুঝতে পেরেছিলো যে নিলাও ছেলেটাকে ভালোবাসে।কিন্তু আবির ত আর সেইটা জানে না।আবিরের সময়ই যেন যায় না।

চোখের জলে মিনিটের পর মিনিট চলে যায় রাতে।নিলাকে ত সে ভালোবাসার সুযোগ ই পেলো না।এভাবে দিনের পর দিন আবিরের কষ্ট যেনো বেড়েই চলে।হঠাৎ তার মাথায় চিন্তা আসে এতো কষ্টে বেঁচে থেকে কি করবো আমি,আমি বাঁচতে চাই না।এ পৃথিবী আমার জন্য না।বেচে থাকতে চাইনা আমি এ পৃথিবীতে।তখন রাত ৩টা।চারদিকে নিস্তব্ধতা। পুরা ঘর অন্ধকার। হালকা চাঁদের আলো জানালা দিয়ে ঢুকে ঘর একটু আলোকিত হয়েছে।ছোট্ট একটা চিলকুটে লিখে রাখলো আমাকে ক্ষমা করে দিও বাবা।আবির আর সময় নষ্ট করতে চায় না।আগে থেকেই মোটা দরি ব্যবস্থা করে রেখেছিলো।কোনো শব্দ না করে বেডের উপর চেয়ার রেখে সাবধানে ফ্যানের সাথে দরিটি শক্ত করে বাঁধলো।দরির গীট দিয়ে আবারো নিলার কথা স্মরন করলো।নিলা আমার জন্যে তোমাকে আর বদ্ধ ঘরে থাকতে হবে না।আমার জন্যে আর প্রাইভেট মিস দিতে হতে হবে না।আজ তুমি স্বাধীন,তোমাকে আর কেউ বিরক্ত করবে না।এ বলে আবির দরিটি গলায় দিয়ে শক্ত করে বেঁধে পা দিয়ে চেয়ারটা ফেলে দিলো।সবকিছুই যেনো মুহুর্তের মধ্যেই শেষ হয়ে গেলো।এ পৃথিবীতে আবির আর নেই।নিলা কে আর এই আবির বিরক্ত করবে না।সকালে জানাজানি হলে হাজারো মানুষের ভীর জমে।সারা এলাকা যেনো থমকে গেছে।প্রেমের ব্যর্থতার কারণে আবির আত্মহত্যা করেছে।

এদিকে নিলা খবর পাওয়ার পর বাসায় অনেক অনুরোধ করার পরও তার বাবা বাসা থেকে তাকে বের হতেই দিলো না।কারন সে বাইরে বের হলে বিষয়টা আরোও গভীর পর্যায়ে যাবে। নিলার কাছে সবকিছুই যেনো শেষ হয়ে গেলো।সারাক্ষন কাঁদে সে।ঘরের এক কোণে বসে।এভাবে মাসের পর মাস যাওয়ার পর নিলা হালকা স্বাভাবিক হয়।কিন্তু তার আবির কে ভুলতেই পারে না সে।সবসময় আবির তার মনের মধ্যে কল্পনায় থাকে। তার ত সব শেষই হয়ে গেছে।সে ভাবতে থাকে সমাজের কথা দেশের কথা।আবিরের মতো যদি সমাজে অন্য কারো সাথে এমন আত্মহত্যার ঘটনা ঘটে তাহলে এ সমাজে এক অন্ধকার ছায়া নেমে আসবে।না, নিলা এইটা হতে দিবে না।নিলা পরিকল্পনা গ্রহণ করে যে সে একটা অরগানাইজেশানে থাকবে যেখানে আত্মহত্যা প্রতিরোধে কাজ করবে।এ সমাজের একটি ছেলেও যদি তার আবিরের মতো আত্মহত্যা না করে সেই পরিকল্পনার আলোকেই নিলা BTF(Brighter Tomorrow Foundation) এর সাথে পথচলা শুরু করে।দিনে দিনে সোসাল মিডিয়া তে আত্মহত্যা প্রতিরোধের জন্য নানা পোস্ট করে।মাসে মাসে বিভিন্ন এলাকায় আত্নহত্যা প্রতিরোধে সামাজিক সচেতনতা সৃষ্টি করতে থাকে।বিভিন্ন টেলিভিশন চ্যানেলে আত্মহত্যার কারণ এবং এগুলো দূর করতে নানা পদক্ষেপ গ্রহন করে।তার সামাজিক কাজকর্ম দেখে সমাজের আরোও অনেক মানুষ অনুপ্রাণিত হয়ে তার সাথে কাজে যুক্ত হয়েছে।এভাবেই আবিরকে তার মনের এক কোণে কল্পনায় রেখে সমাজের জন্যে,দেশের জন্যে কাজ করে যাচ্ছে নিলা।

About Joypur Hat

Check Also

জয়পুরহাটে আদম তমিজী হকের পক্ষ থেকে মাস্ক ও খাবার বিতরণ

জয়পুরহাট জেলা প্রতিনিধিঃমানবিক বাংলাদেশ সোসাইটির চেয়ারম্যান মানবিক বন্ধু আদম তমিজী হকের পক্ষ থেকে আজ ২২ …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *