Monday , November 23 2020
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
Home / জাতীয় / করোনা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ

করোনা রোগীর স্বজনদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ

করোনা ভাইরাসে মৃত কিংবা আক্রান্ত ব্যক্তি ও তার পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা হচ্ছে। প্রতিবেশীসহ আত্মীয়স্বজনরাও তাদের একঘরে করে রেখেছে। রোগটি নিয়ে সবাই এতটাই আতঙ্কিত যে, রাস্তায় কেউ মারা গেলে ও অসুস্থ পড়ে থাকলেও ভয়ে প্রতিবেশীসহ কোনো মানুষ তার কাছে যাচ্ছে না। অথচ বিপদের এ দিনে প্রতিবেশীরাই সবচেয়ে কাছের স্বজন বলে এতদিন পরিচিত ছিল। তবে করোনা সেই সহানুভূতির কথাটাও কেড়ে নিয়েছে। এতে করোনা রোগী ও তার পরিবারের সদস্যরা মানসিকভাবে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ছেন। পরিবারের সদস্যদের এমনই অবস্থা হয়, তারা জীবিত থেকেও মৃত। অসহনীয় যন্ত্রণার শিকার।

তবে সবার মনে রাখা উচিত, এ পরিস্থিতিতে কাল আপনিও পড়তে পারেন। তাই স্বাস্থ্যবিধি মেনে নিজের নিরাপত্তা বজায় রেখে যতটা সম্ভব এ সময় আক্রান্ত প্রতিবেশীর দিকে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিতে হবে উল্লেখ করে বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা বলেন, করোনা ভাইরাস সামাজিক ব্যাধি। তবে দরকার সচেতনতা। মাস্ক পরলে এই রোগ থেকে রক্ষা পাওয়া যায়। তাই আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির পরিবারের সঙ্গে কোনোভাবেই অমানবিক আচরণ করা যাবে না।

একটি বাস ঢাকা থেকে ছেড়ে জয়পুরহাট যাচ্ছিল, পথের মধ্যে অসুস্থ এক ব্যক্তি তার মায়ের পাশেই মৃত্যুর কোলে ঢলে পড়ে। এরপরে করোনায় মৃত্যু হয়েছে সন্দেহে ওই মরদেহসহ অসহায় মাকে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয় জয়পুরহাট-বগুড়া সড়কের হিচমি নামক স্থানে। এর আগেও করোনা সন্দেহে বৃদ্ধ এক মাকে গাজীপুর জঙ্গলে ফেলে রেখে যাবার ঘটনা ঘটেছিল। আবার এক ব্যক্তি করোনা আক্রান্ত হওয়ার পরে তার স্ত্রী-সন্তানরা তাকে বাড়িতে ঢুকতে না দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। করোনাকালে মানুষের প্রতি মানুষের এ কেমন আচরণ! ৩৮ বছরের সাইফুল ইসলাম করোনায় আক্রান্ত হয়ে গত ১ জুন রাজধানীর একটি কোভিড ডেডিকেটেড হাসপাতালে মারা যান। সাত মাস পরও তার স্ত্রী এবং শিশুকন্যার জীবন স্বাভাবিক হয়নি। পারিপার্শ্বিক চাপ আর নানান স্টিগমাতে পড়ে পরিবারটির নাজুক অবস্থা। সাইফুল ইসলামের স্ত্রী তানিয়া সুলতানা বলেন, ‘যে কোনো মৃত্যুতে তার পরিবারের প্রতি সহমর্মী হয় মানুষ, আশপাশের স্বজন ও আত্মীয়। তাদের যতটা পারা যায় আগলে রাখার চেষ্টা চলে। অথচ আমার স্বামী করোনায় মারা যাওয়ায় পাশ থেকে সবাই সরে গেল।’ তানিয়া বলেন, ‘উনার স্বামী করোনায় মারা গেছে, প্রতিদিন এই কথার মুখোমুখি হচ্ছি। ছাদে গেলে অন্যরা নেমে যাচ্ছে, কথা বলছে না, অনেক কিছু ফেস করছি প্রতিদিন।’ চারপাশের এই স্টিগমাতে অসুস্থ তানিয়া। জানালেন, তিনি দুই জন মনোরোগ বিশেষজ্ঞের কাছে কাউন্সেলিং নিচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এটা যাদের ওপর দিয়ে যাচ্ছে, কেবল তারাই বুঝতে পারবে। সমাজের এ কেমন আচরণ? বেঁচে থেকেও দুর্বিষহ এক অভিজ্ঞতার ভেতর দিয়ে যাচ্ছি।’

করোনায় আক্রান্ত রোগীর মৃত্যুর পর পরিবারের সদস্যদের প্রতি সহমর্মিতা, সহযোগিতা করার বিষয়ে কোভিড অ্যান্ড মেন্টাল হেলথ-বিষয়ক জাতীয় প্রস্তাবিত গাইড লাইনে প্রস্তাব রেখেছেন বিশেষজ্ঞ চিকিত্সকরা। তারা বলছেন, অ্যাবনরমাল গ্রিফ রিঅ্যাকশন বা গ্রিফ কাউন্সেলিং প্রকৃতপক্ষে সাইকোলজিস্টদের দেওয়ার কথা নয়। এটা দেবে পরিবারের সদস্য, বন্ধু, ইমাম, শিক্ষক, জনপ্রতিনিধিসহ আত্মীয়রা। এটা একটা সোশ্যাল সাপোর্ট। এটা তৈরি করা গেলেই কেবল গ্রিফ রিঅ্যাকশন দূর হবে। বিশেষজ্ঞরা বলছেন, গ্রিফ হচ্ছে মৃত্যুশোক। সাধারণভাবে মৃত্যুর পর মানুষের গ্রিফ রিঅ্যাকশন বা আবেগের প্রতিক্রিয়া ৪৫ দিন পর্যন্ত স্থায়ী হয়। এর পরও যদি ওই শোক স্থায়ী থাকে এবং তার আবেগ ও আচরণে পরিবর্তন থেকেই যায়, তখন তাকে বলা হয় ‘অ্যাবনরমাল গ্রিফ রিঅ্যাকশন’। সেটা বেশি হয় অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যুতে। একজন বৃদ্ধ মানুষের স্বাভাবিক মৃত্যুতে পরিবারের সদস্যদের গ্রিফ রিঅ্যাকশন সাধারণত হয়। কিন্তু করোনার মতো অনাকাঙ্ক্ষিত মৃত্যু হলে একজন বৃদ্ধের নাচ্যারাল ডেথও অ্যাবনরমাল ডেথ হিসেবে গণ্য হবে।

প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ব্যক্তিগত চিকিত্সক অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, দেশে করোনার চেয়ে কঠিন রোগ আছে। এইডস, হেপাটাইটিস বি সহ ২০ ধরনের সংক্রমণ রোগ রয়েছে। করোনা রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা ঠিক না। এটি একটি ভুল ধারণা। এক সময় এইডসের রোগীকে মাটি দেওয়া যেত না। ভীতি ছিল যে, ওই মাটি থেকে রোগ ছড়াবে। এখন সেই অবস্থা থেকে আমরা সচেতন হয়েছি। এইডস কীভাবে হয় সবাই তা জানেন। তেমনি করোনা কীভাবে ছড়ায় সেটিও জানা আছে। স্বাস্থ্যবিধি মানলে করোনা কোনো রোগই নয়। অধ্যাপক ডা. এ বি এম আব্দুল্লাহ বলেন, মানুষের অবৈজ্ঞানিক চিন্তা-ভাবনা পরিহার করতে হবে। করোনা রোগী ও তাদের পরিবারের সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা যাবে না।

করোনা ভাইরাস মোকাবিলায় গঠিত জাতীয় টেকনিক্যাল পরামর্শক কমিটির সদস্য, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি ও বিশ্ববিদ্যালয়ের ভাইরোলজি বিভাগের সাবেক চেয়ারম্যান অধ্যাপক ডা. নজরুল ইসলাম বলেন, করোনা রোগী ও তার পরিবারের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করা দুঃখজনক। নানা ধরনের সংক্রমণ ব্যাধি নানাভাবে ছড়ায়। মাস্ক পরলে করোনা ছড়ায় না। মানুষের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করতে হবে। করোনা রোগীর সঙ্গে নিষ্ঠুর আচরণ করা থেকে বের হয়ে আসতে হবে।

মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউটের সাবেক পরিচালক অধ্যাপক ডা. গোলাম রাব্বানি বলেন, স্বাস্থ্যবিধি মানলে করোনা কোনো রোগই না। করোনা রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করাটা বিজ্ঞানসম্মত চিন্তা-ভাবনা নয়। তিনি বলেন, করোনা রোগীর মানসিক সাপোর্ট খুবই প্রয়োজন। এক্ষেত্রে সমাজের সর্বস্তরের মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে।

প্রখ্যাত মনোরোগ বিশেষজ্ঞ অধ্যাপক ডা. মোহিত কামাল বলেন, যার জ্ঞান নেই, মুর্খ্য তারাই করোনা রোগীদের সঙ্গে অমানবিক আচরণ করে। তিনি বলেন, সামাজিক ও মানসিক সাপোর্ট চিকিত্সার অংশ। আর এটা প্রতিবেশীরা দিতে পারেন। তিনি বলেন, মানসিক সাপোর্ট না দিলে রোগী রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা হারিয়ে ফেলেন।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক (ডিজি) অধ্যাপক ডা. আবুল বাশার মোহাম্মদ খুরশীদ আলম বলেন, করোনায় আক্রান্ত ও মৃত ব্যক্তির সঙ্গে কী ধরনের আচরণ করতে হবে—সেই ব্যাপারে সচেতনতা সৃষ্টির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে মসজিদে মসজিদে প্রচারণার নির্দেশনা দেওয়া আছে। প্রত্যেক মন্ত্রণালয়ের কার কী কাজ সব নির্ধারণ করে দেওয়া আছে। কিন্তু এক্ষেত্রে অনেকে কার্যকর ভূমিকা রাখছেন না। সচেতনতা সৃষ্টিতে জনপ্রতিনিধিদের ভূমিকা রাখার আহ্বান জানান তিনি।

About Joypur Hat

Check Also

কাঁদলেন নির্জনকক্ষে বন্দী মিন্নি

বরগুনায় রিফাত শরীফ হত্যা মামলায় মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি ও নিহতের স্ত্রী আয়শা সিদ্দিকা মিন্নির কান্নাকাটি করেছেন। …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *