Friday , February 26 2021
Home / সফলতার গল্প / জয়পুরহাটের কবি পরিনা’র জীবনের ইতিকথা,যা আপনার হৃদয়কে নাড়া দেবে!

জয়পুরহাটের কবি পরিনা’র জীবনের ইতিকথা,যা আপনার হৃদয়কে নাড়া দেবে!

১৩ ই আগস্ট,২০২০/জয়পুরহাট নিউজ ২৪/ডেস্ক রিপোর্ট
“অন্যকে কষ্ট দিয়ে হাসে,যে শান্তি পায় অন্যের সর্বনাশে,সে নিজেও সুখ পাবেনা ঐ সৃষ্টিকর্তার কাছে
আজ যে অন্যকে কাঁদিয়ে পাচ্ছে সুখ,কাল তাকেও কাঁদিয়ে হাসবে লোক”
উপরোক্ত কথাগুলো এই সমাজের কিছু স্বার্থ লোভী মানুষের উদ্দেশে কবি পরিনার লেখা “মিসকল দিও” কাব্যগ্রন্থ থেকে সংগৃহীত।
মাত্র দশ মাস বয়স থেকে এক সন্তানহীন দরিদ্র পরিবারে কবি পরিনা লালিত পালিত হয়েছেন। বড় হয়ে নিজের মাকে চিনলেও আজও চিনেন না নিজের বাবাকে। নওগাঁ জেলার বদলগাছীর থানার জামালগঞ্জে অত্যন্ত গরীব সন্তানহীন এক পরিবারের কলা বিক্রেতা বৃদ্ধ বৃদ্ধার কাছে বড় হয়েছেন পরিনা। কোন রকম SSC পাশ করেই পালিত বৃদ্ধ বাবা মায়ের দায়িত্ব নিতে কবিকে খুঁজে নিতে হয়েছে কাজ। কবি পরিনার পালিত বাবার বর্তমানে বয়স আশির্ধো, মায়ের বয়সও প্রায় সত্তর। কবি পরিনার পালিত বাবা মা বর্তমানে জয়পুরহাট জেলার পাঁচবিবি উপজেলার শিরোট্টি গ্রামে ভাগিনার বাড়িতে থাকেন। ১১ বছর ধরে পরিনা বাবা মাকে খরচ দিয়ে আসছেন। বিকাশে খরচ পাঠান। সুযোগ মতো নিজেও গিয়ে দেখে আসেন বাবা মাকে।
২০০৯ সালে মাত্র ১২০০ টাকা বেতনে নাটোর প্রাণ কোম্পানিতে চাকরি নেন কবি পরিনা। সেই সময় পরিনার কাছে মনে হয়েছে এই অল্প বেতনে বাবা মাকে না দিতে পারলেও অন্তত আপাততো তার নিজের খরচ হবে। বৃদ্ধ বাবা মায়ের উপর থেকে নিজের বোঝা তো কমবে!
কর্মস্থলে এসে কবি পরিনার সাথে পরিচয় হয়  সালেহা নামের এক নম্র ভদ্র মহান মানুষের। সালেহা আপার বাড়ি রাজশাহী জেলার পুঠিয়া থানায়। সালেহা আপার ছোটবেলায় মাত্র ক্লাস ফোরে পড়া অবস্থায় বাল্য বিবাহ দেয় পরিবার। কিন্ত সেই সময় ছোট্ট সালেহা আপার লেখা পড়ার তীব্র নেশা ও বয়সে অত্যন্ত ছোট হওয়ায় সংসার সম্ভব হয়না।
মধ্যবিত্ত পরিবারে শত চেষ্টার মাঝে অনেক কষ্টে ২০০৯ সালে সমাজ কর্মে মাস্টার্স পাশ করেন সালেহা আপা। প্রাইমারী পরীক্ষায় রিটেনে দুইবার নির্বাচিত হওয়ার পরও চাকরি হয়নি সালেহা আপার।
টেক্কাটেক্কির সমাজে শান্তি প্রিয় সালেহা আপার ইচ্ছা হয়না চাকরির জন্য যুদ্ধ করার। তাই মাত্র ২২৭৫ টাকা বেতনে প্রাণ কোম্পানিতে জয়েন করেন সালেহা আপা। কর্মস্থলে এক সাথে চাকুরি করা ও এক রুমে থাকার সুবাদে কবি পরিনার পরিচয় হয় সালেহা আপার সাথে।
সালেহা আপা যখন জানতে পারেন পরিনা কোন রকম SSC পাশ করে টাকার অভাবে পড়াশুনা বাদ দিয়ে বৃদ্ধ বাবা মায়ের তিনবেলা খাবার যোগাতে কাজ করতে এসেছে তখন সালেহা আপা বলেন,
“পরি আমার বাবা মা বেঁচে নেই। তাদের আমি আমার ইনকাম খাওয়াতে পারিনি। কিন্তু তোমার বাবা মা বেঁচে আছে। অথচ তুমি তাদের খরচ দিতে কত চেষ্টা করছো। আজ থেকে আমার সকল টাকা তোমার টাকা। টাকা আমার পছন্দ নয়। খেতে হবে তাই চাকরি করা। তোমার আমার টাকার কোন ভাগাভাগি নেই। তুমি তোমার মতো করে খরচ করো। বাবা মাকে দাও। আমার শুধু খাওয়া খরচ হলেই হয়।”
সেই থেকে সালেহা আপা কোনদিন তার টাকা হাতে নিতে চায়না। দুজন এক সঙ্গে খায়। পরিনার বৃদ্ধ বাবা মাকে দেয়।
২০০৯ সালে যখন পরিনা প্রাণ কোম্পানিতে ভর্তি হয় তখন তাঁর বেতন ছিলো মাত্র ১২০০ টাকা।
সালেহার বেতন ছিলো ২২৭৫ টাকা।
এই সমাজে কত মানুষ লক্ষ লক্ষ টাকার মালিক হয়েও কাউকে সহযোগিতা করার কথা চিন্তা করতে ভয় পায়। অথচ সালেহা আপা ২২৭৫ টাকা বেতনের চাকুরিজীবী হয়েই পরিনার পাশে দাঁড়িয়েছে। কারন হিসেবে সালেহা আপা বলেন, “আমার মনের শান্তির জন্যই আমি পরিনার পাশে আছি। পরিনাকে ভালোবাসলে, তাঁকে সহযোগিতা করতে পারলে আমার মনেই শান্তি পাই”
সালেহা আপা সম্পর্কে পরিনা আবেগাপ্লুত হয়ে বলেন, “আমার জানা মতে সালেহা আপুর সাথে যখন আমার পরিচয় হয় তখন সালেহা আপুর একটি ভালো ড্রেসও ছিলোনা কারোও দাওয়াতে যাওয়ার মতো। কোম্পানীর ইউনিকর্ম পড়ে অফিস করতাম। কিন্তু কোন সহকর্মী দাওয়াত করলে আমরা বিভিন্ন অযুহাত দেখিয়ে কেটে দিতাম। যেতাম না। তখন তারা মনে মনে রাগ হতো, আমাদের অসামাজিক বা অহঙ্কার হয়তো ভাবতো। কিন্তু আসল ঘটনা হলো সালেহা আপুর একটা ভালো ড্রেস ছিলোনা বাহিরে যাবার মতো। আমি জোর করলেও সালেহা আপু ড্রেস কিন্ত না, বরং তার বেতনের টাকা দিয়ে আমার বাবা মায়ের জন্য বাজার পাঠাতো, আমার জন্য খরচ করেই শেষ করে দিতো। আজও সালেহা আপু দামী ভালো ড্রেস নেয়না। আজও আমাকেই সাজানোই তার শান্তি। এই স্বার্থের পৃথিবীতে সালেহা আপুর মতো মানুষ বিরল।”
কবি পরিনা আরও বলেন, “আমার ও সালেহা আপুর  ১২০০+২২৭৫= ৩৪৭৫ টাকা বেতন দিয়ে বাবা মাকে কোন রকম এক মাসের চাল কিনে দিয়ে  দুজন ৫০০ টাকা ঘর ভাড়া দিয়ে এক মাস চলার সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে এখনো  অবাক হই। কতদিন আমি ও সালেহা আপু চাল কিন্তুে না পেরে অত্যন্ত কম দামে ভাঙ্গা নুডুলস কিনে রান্না করে খেয়েছি। এক জুতা বার বার সেলাই করার পরও আবার ছিঁড়ে গেলে সেলাই করতে গিয়ে শরমে মুচির দোকানের কয়েক হাত দুরে দাড়িয়ে থেকেছি। মুচি তাকিয়ে হেসে বলেছে, “আপা আবার!? এবার জুতা কিনেন।” বলতাম, কিনবো। আর কিছু দিন চলুক।”
এভাবে চলতে থাকে। কবি পরিনার জন্য সালেহা আপার সেক্রিফাইস এখনো করছেন। প্রতি বছর অল্প অল্প করে বেতন বেড়েছে। সর্বশেষ যখন ৯ বছর পর প্রাণের চাকরি ছেড়ে দেয় কবি পরিনা ও সালেহা তখন পরিনার বেতন ছিলো ৯৬০০ টাকা আর সালেহা আপার বেতন হয়েছিলো ১২৫০০ টাকা।
এত কষ্টের মাঝেও সালেহা আপা কিছু কিছু সঞ্চয় করে কবি পরিনার পাঁচ বছর পড়াশোনায় ব্রেক যাওয়ার পরে আবার নাটোর দীঘাপতিয়া এম কে কলেজে উন্মুক্ততে ভর্তি করে দেয় পরিনাকে। কবি পরিনা HSC পাশ করেন। তারপর আবার কবি পরিনাকে ডিগ্রীতেও ভর্তি করে দেন সালেহা আপা। এবার ডিগ্রী থার্ড ইয়ারে কবি পরিনা। ২০২০ সালে ডিগ্রী ফাইনাল পরীক্ষা দিবেন পরিনা।
সালেহা আপা ও পরিনার বন্ধুত্বের ১০ বছর পেড়িয়ে ১১ বছর চলছে। সালেহা আপা এখন পরিনার পরিবার। সালেহা আপার ভাই বোন পরিনার ভাই বোন, সালেহা আপার বাড়ি পরিনার বাড়ি, সালেহা আপার গ্রাম পরিনার গ্রাম, সালেহা আপার গ্রামের মানুষ পরিনার গ্রামের মানুষ, সালেহা আপার আত্মীয় পরিনার আত্মীয়। সবাই ভালোবাসে পরিনাকে। প্রাণ কোম্পানির চাকরি ছেড়ে ভালো বেতনে নতুন একটি চাকরিতে জয়েন করেছিলেন পরিনা ও সালেহা আপা। ভালো ছিলো বেতন ও পরিবেশ। কিন্তু মালিকের ব্যক্তিগত সমস্যার ফ্যাক্টরিটা বন্ধ হয়ে যায়। তারপর থেকে আপাততো তাঁরা দুজনেই বেকার। তবুও জমানো সঞ্চয় থেকে এবং কাছের বন্ধুদের সহযোগিতায় বাবা মাকে বেকার অবস্থায়ও চলার মতো খরচ কষ্ট হলেও দিচ্ছেন।
কবি পরিনা বলেন, “ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছি জন্ম নিয়ে বিভিন্ন জনের কটু কথা শুনতে শুনতে। বাবার বয়সী মানুষদেরও কুনজর দেখেছি। অত্যন্ত গরীব সন্তানহীন বৃদ্ধ বৃদ্ধার কাছে বড় হয়েছি বলে অনেকেই সেই অসহায়ত্বের সুযোগ নিতে চেয়েছেন। অনেকেই ভেবেছেন গরীব ঘরের মেয়ে খুব সস্তা। ইচ্ছা করলেই পাওয়া যায়। কিন্ত তাদের সেই ধারনাকে আমি ঘৃণার  মিথ্যা প্রমাণিত করেছি।
শত কষ্টেও নিজের ব্যক্তিত্বকে বিসর্জন দেইনি।একা একা গোপনে কাঁদতে কাঁদতে বড় হয়েছি। হেসেছি সবার সামনে, কেঁদেছি গোপনে। গরীব বৃদ্ধ বাবা মায়ের কাছে বড় হয়েছি। তাদেরকেই বাবা মা বলে জানি।
যতটুকু শুনেছি ১০ মাস বয়স থেকে তারা আমাকে লালন পালন করেছেন। আজোও নিজের বাবা নামক….. চিনিনা।
বড় হয়ে শুনেছি কেউ কেউ বলে আমার এই বৃদ্ধ কলা বিক্রেতা বাবা আমাকে রেললাইনে কুরিয়ে পেয়েছিলো, তবে বেশির ভাগ লোকের মুখেই শুনেছি আমার নিজের মা আমার বাবাকে পালক দিয়েছে।
তবে আমি আমার জন্মদাত্রী মাকে চিনলেও বাবার পরিচয় দেয়না মা। জানিনা কেন!? সে যাকগে, হয়তো কোন কঠিন পরিস্থিতির স্বীকার হয়েই আমার মা এমনটা করেছেন। একটা সময় এসব নিয়ে কষ্ট পেলেও এখন আর কষ্ট পাইনা। সয়ে গেছে। এখন আর এসব পরিচয় দরকারও মনে করিনা। কারন পাথর চাপা হলুদ ঘাষের মতো আমার তীব্র কষ্টের দিনগুলো এখন ক্রমশ সবুজ হয়ে উঠছে। আল্লাহ সালেহা আপুর মতো একজন মহান মানুষকে আমার পাশে দিয়েছেন এটা আল্লাহর বড় দান আমার জীবনে। এখন আমার একটি ভালো চাকরি হলেই হয়। চেষ্টা করছি ইনশাআল্লাহ হবে।”
কবি পরিনার ৪ টি কাব্যগ্রন্থ, ১টি ছোট গল্প ও ১টি গীতিকাব্য সহ মোট ৬টি বই প্রকাশিত হয়েছে। তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থ সমূহ হলো ১. তুমি আসবে বলে ২. মনের কোন বয়স নেই ৩. মিসকল দিও ৪. মনের কথা গানে গানে ৫. কবে যেনো ভালো ছিলাম ৬. সব কিছু ফিরিয়ে দেয়া যায় না।এছাড়াও পরিনার লেখা “আফসোস” শিরোনামের একটি গানও CMV Music থেকে লিরিক ভিডিও হিসেবে রিলিজ হয়েছে। গানটি গেয়েছেন ক্লোজআপ ওয়ান খ্যাত জনপ্রিয় শিল্পী রিংকু।
পরিনার মতে, জীবনে চলার জন্য কোটি কোটি টাকার দরকার হয়না। দামী গাড়ি বাড়ি, কোটি টাকার স্বপ্ন নেই কবি পরিনার। সততার সাথে চলতে চান বাবা মাকে চালাতে চান। কবি পরিনার ইচ্ছা সমাজের অসহায়দের জন্য কিছু করার। সমাজ সেবা করার স্বপ্ন রয়েছে কবি পরিনার।
কবি পরিনা সকলের কাছে দোয়া চায় তাঁর জন্য।

About Joypur Hat

Check Also

জয়পুরহাটের সফল শিল্প উদ্যোক্তা ইমুর সফলতার গল্প

  যুব সমাজই পারে অসম্ভবকে সম্ভাবনার বাস্তবতা দিয়ে জয় করে নিতে,তেমনই একজন আধুনিক চিন্তা চেতনার …