Saturday , April 24 2021
Home / মুক্তিযুদ্ধ, ইতিহাস ও ঐতিহ্য / জেনে নিন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ কালাই উপজেলার কৃতি সন্তান ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে-

জেনে নিন ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ কালাই উপজেলার কৃতি সন্তান ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরী সম্পর্কে-

ডেস্ক রিপোর্ট

যাকে স্মরণ করছি, তিনি ব্রিটিশ খেদাও আন্দোলনের অগ্নিপুরুষ। এছাড়া ভাষা আন্দোলন, বাংলাদেশের স্বাধীনতা অন্দোলন, সংগ্রামী রাজনীতির জ্ঞানসমৃদ্ধ, আত্মপ্রচারবিমুখ, অকৃতদার, ঋষিতুল্য, কিংবদন্তি বিপ্লবী। মাস্টারদা বললে যেমন সূর্য সেনের নাম বলার প্রয়োজন হয় না, রাজনীতির অঙ্গনে ডাক্তারদা বললেই তাকে অনেকে চেনেন। তার ধ্যান, জ্ঞান, সাধনা ছিল সাধারণ মানুষের মুক্তি। সুখী হোক মানুষ, সুন্দর হোক পৃথিবী। তার পুরো নাম ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরী, বাবা আব্দুল লতিফ চৌধুরী ও মা রহিমা খাতুন চৌধুরী। জয়পুরহাট জেলার (আগের বৃহত্তর বগুড়া) কালাই উপজেলার কাটাহার শমসীরা গ্রামে ১৯০১ সালের এক জমিদার পরিবারে এই দিনে জন্মগ্রহণ এবং ১৯৯৭ সালে ২ নভেম্বর নিজ বাসভবনে তিনি মৃত্যুবরণ করেন।
নানাবাড়িতে (শিকারপুর) প্রাথমিক শিক্ষা শেষে বগুড়া করনেশন হাই স্কুলে লেখাপড়া করেন ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরী। এখানে লেখাপড়া করার সময় ১৯২১ সালে খেলাফতের অসহযোগী আন্দোলনে অংশ নিয়ে জেলে যান। পিতার প্রথম সন্তান হিসেবে জমিদারি দেখাশোনার দায়িত্ব গ্রহণ না করায় পরিবার থেকে তার লেখাপড়ার খরচ বন্ধ করে দেওয়া হয়। কালাজ্বরে ভুগে প্রাইভেটে এন্ট্রাস পাস করার পর মামাবাড়ি থেকে বগুড়া মেডিক্যাল স্কুলে ১ বছর পড়ার পর ঢাকা মেডিক্যাল স্কুল থেকে ডাক্তারি (ন্যাশনাল) পাস করেন। বঙ্গভঙ্গ আন্দোলন, ক্ষুদিরামের ফাঁসি, রুশ বিপ্লব, জালিয়ানওয়ালা হত্যাকা- তার মনে গভীর দাগ কাটে। স্কুলের এক বন্ধুর মুখে বগুড়ার বিপ্লবী প্রফুল্ল চাকীর গৌরবময় আত্মদানের কথা তাকে আন্দোলিত করে। সে সময় পরিচয় হয় যতীন্দ্র মোহন রায়ের সঙ্গে। তিনি জয়পুরহাট জলআটুল, কালাইয়েরহাট শহরে গণমঙ্গল চালু করেন। সে সময় ডাক্তারদা কংগ্রেসের রাজনীতিতে জড়িত ছিলেন। রাজনৈতিক বন্ধুদের সহযোগিতায় বাঘা যতীন রাজবিহারী বসুর রাজনীতির সঙ্গে যোগাযোগ শরু করেন। এ সময় রুশ বিপ্লবে উৎসাহিত হন। ১৯৩০ সালে লবণ সত্যাগ্রহ আন্দোলনে দিনাজপুরের হিলিতে বক্তৃতাকালীন পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। তিনি বগুড়া জেলার কংগ্রেসের ডিরেক্টর নির্বাচিত হন। ১৯৩০ সালে কংগ্রেসের নিখিল ভারত সম্মেলনে (কলকাতার ধর্মতলায়) যোগ দেন। এরপর কংগ্রেস ছেড়ে রাজবিহারী বসুর অনুশীলন পার্টিতে যোগ দেন। ১৯৩৩ সালের ১৪ নভেম্বর বগুড়া শহর থেকে তিনি গ্রেপ্তার হন। ১৯৩৪ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি ট্রাইব্যুনাল ঘোষিত রায়ে যাবজ্জীবন করাদ- হলে তাকে আন্দামান নিকোবর কালাপানির দ্বীপের সেলুলার জেলে পাঠানো হয়। জেলে থেকেই তিনি মার্কস, অ্যাঙ্গেলস, লেনিন, ক্যাথলিন ও রুশ বিপ্লবের বই পড়েন। জেল কর্তৃপক্ষের ঘৃণ্য অসহনীয় নির্যাতনের বিরুদ্ধে রাজন্দিরা ৩৭ দিন অনশন করেন। এ খবরে ভারতজুড়ে তোলপাড় শুরু হয়। ভারতবাসীর আন্দোলনের চাপে ১৯৩৮ সালের জুলাইয়ে আন্দামান রাজবন্দিদের দমদম সেন্ট্রাল জেলে আনা হয়। এখানে ডাক্তারদাসহ বন্দিরা মামলা প্রত্যাহার ও মুক্তির দাবিতে দ্বিতীয় দফা আমরণ অনশন শুরু করেন। এ অনশনে মহাত্মা গান্ধী, ডাক্তার রাজেন্দ্র প্রসাদ, ডাক্তার বিধান চন্দ্র রায় জেলখানায় তাদের সঙ্গে দেখা করেও অনশন ভাঙাতে পারেননি। পরে নেতাজি সুভাষ চন্দ্র বসুর আশ্বাসে ৩৬ দিন পর অনশন ভঙ্গ করেন। ১৯৩৯ সালে ডাক্তারদাসহ রাজবন্দিরা দমদম জেল থেকে মুক্তি পান।

ডাক্তারদা জেল থেকে মুক্তি পাওয়ার পর ভারতের কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মোজাফ্্ফর আহমদের কথায় বগুড়ার কমিউনিস্ট রাজনীতির গোড়াপত্তন করেন। বগুড়া ছাড়াও দিনাজপুর, রাজশাহী, রংপুরে তার কর্মপরিধি বিস্তৃত করেন। ভারতের প্রখ্যাত কমিউনিস্ট নেতা আব্দুল্লাহ রসুল বগুড়ায় এসে ডাক্তার কাদের চৌধুরীকে কমিউনিস্ট পার্টির কার্ড হাতে তুলে দেন। বগুড়ার ডাক্তার সুধীর চন্দ্রের বাগানবাড়িতে ১৯৪৩ সালে প্রথম কমিউনিস্ট পার্টির সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। এ সম্মেলনে ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরীকে সাধারণ সম্পাদক নির্বাচন করা হয়। ১৯৫৮ সাল পর্যন্ত তিনি এ দায়িত্ব পালন করেন। গৃহছাড়া ডাক্তার চৌধুরী জার্মানি, জাপানের ফ্যাসিবাদ জনযুদ্ধের বিরুদ্ধে কাজ করেন। ১৯৫৮ সালে আইয়ুব শাসন আমলে গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৬৭ সালে মুক্ত হন। আবার ১৯৬৮ সালে গ্রেপ্তার হয়ে ১৯৭০ মুক্তি পান। এর আগে বগুড়া, রাজশাহী, রংপুর, দিনাজপুরে কৃষক ও তেভাগা আন্দোলন দ্রুতবেগে ছড়িয়ে দেন। ১৯৫২ সালে রাষ্ট্রভাষা আন্দোলনে আত্মগোপনে থেকে বগুড়া ও বগুড়ার পশ্চিম অঞ্চলে নেপথে নেতৃত্ব দেন। ১৯৭০ নির্বাচনে আওয়ামী লীগ জয়ী হলে ইয়াহিয়া ক্ষমতা আটকে ধরেন। ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবিতে প্রতিটি মিছিল-মিটিংয়ে সক্রিয় ভূমিকা রাখেন তিনি। ন্যাপ থেকে আন্দোলন, সংগ্রাম চালিয়ে যান। সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি ১৯৭১ সালের ২৭ মার্চ ডাক্তারদাকে ভারতে পাঠায়। মুজিবনগর সরকার গঠনের আগে (১৯৭১ সালের ১৭ এপ্রিল) আকাশবাণী কলকাতা বেতারকেন্দ্র থেকে প্রথম যে বাঙালি নেতার কণ্ঠ বহির্দেশীয় বেতারে প্রচার হয়, তিনি ডাক্তার আব্দুল কাদের চৌধুরী। ৭০ বছর বয়সে তারুণ্যের উদ্দীপনা নিয়ে গৌরবোজ্জ্বল দায়িত্ব পালন করেন।

About Joypur Hat

Check Also

জয়পুরহাটে কৃতি সন্তান কবি আতাউর রহমান

ডেস্ক রিপোর্ট জয়পুরহাট জেলার আক্কেলপুর উপজেলায় কবি আতাউর রহমান ১৯২৫ সালের ৮ মে জন্মগ্রহণ করেন। …