Thursday , October 22 2020
সদ্যপ্রাপ্ত সংবাদ
Home / সফলতার গল্প / একজন শাহনাজ রানু, অনুপ্রেরণার উৎস

একজন শাহনাজ রানু, অনুপ্রেরণার উৎস

জয়পুরহাটের কৃতি সন্তান শাহনাজ আখতার রানু

ডেস্ক রিপোর্ট

জয়পুরহাটের কৃতি সন্তান শাহনাজ আখতার রানু।২৭ তম বিসিএসে সুপারিশপ্রাপ্ত হয়ে বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক পদে কর্মরত আছেন।যিনি অধ্যবসায় আর কঠিন পরিশ্রমের বিনিময়ে ছিনিয়ে নিয়েছেন জীবনের সফলতা। বুঝিয়ে দিয়েছেন নারী-পুরুষ, বা উত্তর-দক্ষিণবঙ্গ কোন বিষয় নয়। প্রবল ইচ্ছা শক্তিই পারে জীবন যুদ্ধে জয় লাভ করাতে।

সম্প্রতি শাহনাজ রানুর মুখোমুখি হয় জয়পুরহাট নিউজ টুয়েন্টিফোর।দীর্ঘ আলাপে নানা বিষয়ে তার সাথে কথা বলেছেন সম্পাদক Rabiul Islam Rimon,তা পাঠকদের জন্য তুলে ধরা হল।

শাহনাজ রানুর হাতেখরি হয় পাঁচবিবির বালিঘাটা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।সেই স্কুলের প্রধান শিক্ষক প্রয়াত চিত্তরঞ্জন স্যারের অপরিসীম স্নেহের চিরকৃতজ্ঞ তিনি।বয়সে সমবয়সী বাচ্চাদের থেকে একটু ছোট হবার কারনে স্কুলে ম্যাজিস্ট্রেট আসলে প্রশ্নের সম্মুখীন হতেন শাহনাজ রানু,যা ছিল একপ্রকার মধুর বিড়ম্বনা।১৯৯১ সালে তৎকালীন প্রাথমিক সমাপনী পরীক্ষায় ৬০০ নাম্বারের ভেতরে ৫৯৬ নাম্বার পেয়ে জয়পুরহাট জেলায় প্রথম হন তিনি,পাশাপাশি ট্যালেন্টপুলে বৃত্তি পান।এটি ছিল তার জীবনের প্রথম বড় সফলতা।

ষষ্ঠ থেকে দশম শ্রেণী পর্যন্ত তিনি অধ্যয়ন করেন পাঁচবিবি এন এম সরকারী উচ্চ বিদ্যালয়ে। ক্লাস ওয়ান থেকে টেন পর্যন্ত কোন পরীক্ষাতেই রানু দ্বিতীয় হননি,যা ছিল বিস্ময়কর সাফল্য।শুধু যে একাডেমিক পরীক্ষায় সাফল্য তা কিন্তু নয়,বিতর্ক প্রতিযোগিতা,কবিতা,রচনা,জারি গান, নাটক এমন কোন মাধ্যম নেই যেখানে তার পদচারনা ঘটেনি। এসব নিয়ে দাপিয়ে বেরিয়েছেন উপজেলা,জেলা,বিভাগীয় ও জাতীয় পর্যায়ে।

এসএসসিতে ৮৪৩ নাম্বারসহ ৮ বিষয়ে লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করেন তিনি। এরপর উচ্চ মাধ্যমিকে ভর্তি হন পাঁচবিবি মহিপুর হাজী মোহাম্মদ মোহসিন কলেজে। এইচএসসি পরীক্ষার সময় পক্স হবার কারনে পরীক্ষায় খারাপ করেন।৭৫২ নাম্বারসহ ২ বিষয়ে লেটার মার্কস নিয়ে পাশ করেন তিনি। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের ৩ টি অনুষদে (ইংরেজি,বোটানি,ফার্মেসী) ভর্তি পরীক্ষার আবেদন করেন এবং তিনটিতেই মেধাতালিকায় স্থান পান তিনি। সাহিত্যের প্রতি অসম্ভব দুর্বলতা থাকায় ইংরেজি বিভাগে সম্মানে ভর্তি হন।

বিশ্ববিদ্যালয় জীবনের কথা জানতে চাইলে তিনি বলেন,২০০০ থেকে ২০০৬ পুরো সময়টা ছিল ভিষণ বর্ণিল আর কর্ম উদ্দীপনার।সেই সময়ের সেশনজটের কারনে সময় বেশি লেগেছিল, কিন্তু প্রাণচাঞ্চল্য কমেনি এতোটুকুও।প্রথম বর্ষ থেকেই কোচিং এ ক্লাস নিয়ে,টিউশনি করিয়ে নিজের হাতখরচ নিজেই চালিয়েছি। ভার্সিটি লাইফে টেলিভিশনে ডিবেট করতাম,উদীচী করতাম, রক্তের সংগঠন বাঁধনের সাথে যুক্ত ছিলাম, হলের নানাবিধ সমস্যার বিরুদ্ধে ছিলাম সচ্চার- যোগ করেন তিনি।

অনার্স ভাইভার কিছুদিন পরেই ২৭ তম বিসিএসের বিজ্ঞপ্তি ছিল,সেই সময় এপেয়ার সার্টিফিকেট দিয়েই এপ্লাই করেন তিনি।প্রথমবারেই টিকে যান তিনি।কেয়ারটেকার সরকারের কারনে ২ দফা ভাইভা হয় সেবার।সব বাঁধা বিপত্তি পেরিয়ে ফরেন ক্যাডারে ২০০৮ সালের নভেম্বরে যোগদান করেন তিনি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে সেকেন্ড সেক্রেটারি পদে প্রথম পোস্টিং করেন জাপানে।সেখানে ৩ বছর মেয়াদ পূর্ণ করে বদলী হন কলকাতায়।সেখানে কলকাতাস্থ বাংলাদেশ উপ হাই কমিশনে কাউন্সেলর হিসেবে ৪ বছর চাকুরী করার পর বর্তমানে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের পরিচালক পদে কর্মরত আছেন দক্ষিণ – পূর্ব এশিয়া দপ্তরে।চাকরির সুবাদে ইতিমধ্যেই ১৫ টি দেশ ভ্রমন করেছেন তিনি।ক্যারিয়ারের ক্ষেত্রে তিনি সব সময় আউট অব বক্স চিন্তা করেন,এক্সেপশনাল কিছু করার জন্য সব সময় চেষ্টা করেন বলে জানালেন।

শাহনাজ রানুর আরেক পরিচয় তিনি একজন লেখক।২০১৯ সালের বইমেলায় সময় প্রকাশনী থেকে বের হয়েছে তার প্রথম প্রকাশিত কবিতাগ্রন্থ “নোনতা চোখের গল্প”।এবারের বই মেলায় একই প্রকাশনী থেকে বাংলা ও ইংরেজি দুই ভাষাতেই প্রকাশ হয়েছে তার দ্বিতীয় কবিতাগ্রন্থ “প্রযত্নে কালো শাড়ি’ ।

আপনার দীর্ঘ পথচলায় অনুপ্ররনা/উৎসাহ কে দিয়েছেন?এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন,”আমার বড় বোন শম্পা রুমা ।তিনি রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় থেকে এলএলবি ও এলএলএম করে বর্তমানে জয়পুরহাটের একটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করছেন। পারিবারিক অসচ্চছলতার জন্য যিনি ছাত্রজীবনেই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন। বাবা, মায়ের অবদান অপরিসীম। তাদের দোয়া ও ভালোবাসা ছাড়া এই পর্যায়ে আসা সম্ভব হত না। বাবা ছিলেন চিন্তা ও চেতনায় অত্যন্ত আধুনিক একজন মানুষ, যিনি ছেলে তে আর মেয়ে তে কোন পার্থক্য করেন নি। নিজের সাধ্যমতো সবটুকু দিয়ে মানুষ করবার চেষ্টা করেছেন। আর বড় ভাই, রাজু আহমেদ, সবসময় পাশে থেকেছে সর্বাত্মকভাবে।”

ফরেন ক্যাডারে যারা আসতে চান তাদের জন্য পরামর্শ—ইংরেজিতে দক্ষতা বাড়াতে হবে,প্রতিদিন ইংরেজি পত্রিকা পড়তে হবে,ইংরেজি গল্পের বই পড়তে হবে,ফেসবুকের চ্যাট কিংবা নিজেদের ভেতরে কথা বললেও ইংরেজির চর্চা থাকতে হবে।নিজের দুর্বলতাকে খুঁজে বের করে সেই দুর্বলতা নিয়ে কাজ করতে হবে।বিশ্ব মানচিত্র,বিশ্ব রাজনীতি,নিজের দেশের সাথে অন্য দেশের তুলনা জানতে হবে।জীবনের কোন ক্ষেত্রেই পড়ালেখার কোন বিকল্প নেই, বলেন তিনি।

জয়পুরহাটবাসীর উদ্দেশে শাহনাজ রানু বলেন,”নিজের জন্মভূমির প্রতি আলাদা একটা টান কাজ করে।জয়পুরহাটের যে কোন ভালো সংবাদ শুনলে গর্বিত হই।জয়পুরহাট জেলার সব মেয়ের বাবা মাকে আমার অনুরোধ আপনাদের মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করুন, দেখবেন আপনার মেয়ে যোগ্যতায় একটা ছেলের থেকে কোন অংশেই কম হবে না।আমার প্রিয় জন্মভূমি জয়পুরহাটের মানুষের কল্যাণে কাজ করতে পারলে নিজেকে ধন্য মনে করব।আমি আমার অবস্থান থেকে যতটুকু সাধ্য আছে তা দিয়ে জয়পুরহাটের মানুষদের কল্যাণে কাজ করতে চাই।”

ব্যক্তি জীবনে একটি কন্যা ও একটি পুত্র সন্তানের জননী শাহনাজ রানু সকলের দোয়া প্রার্থী।

About Joypur Hat

Check Also

জয়পুরহাটে দারিদ্র্যতাকে জয় করছেন অসহায় নারীরা

শাহাদুল ইসলাম সাজু,জয়পুরহাট সামাজিক নিরাপত্তা বেষ্টনী কর্মসূচীর আওতায় কাজ করে দারিদ্র্যতাকে জয় করে স্বাবলম্বী হওয়ার …